Contact









ফুটবল খেলাটি বাঙালির নিজস্ব খেলার তালিকায় নেই। তবুও বাংলা অঞ্চলে ফুটবলকে নিছক ছেলেখেলা হিসেবে দেখা মুশকিল। কারণ ধীরে ধীরে বিদেশি এই খেলাটি মিশে গেছে আমাদের জীবনযাপন, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে। তাই ফুটবল নিয়ে বাঙালির উচ্ছ্বাস শুরু থেকেই। বাঙালি লেখকদের লেখাজোকায়ও নানাভাবে এসেছে ফুটবলের প্রসঙ্গ।
প্রমথ চৌধুরী ১৯১৫ সালে রচিত তাঁর ‘সাহিত্যে খেলা’ নামের এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা তা উদ্দেশ্যবিহীন।’ ওই প্রবন্ধে তিনি ‘উদ্দেশ্যবিহীন’ বলতে আনন্দদায়ক বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, খেলা উদ্দেশ্যবিহীন এবং আনন্দদায়ক বলেই কলকাতার টাউন হলের দেশহিতকর বক্তৃতার চেয়ে ‘গড়ের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে’ মানুষ বেশি যায়। খেলা সম্পর্কে, বিশেষত ফুটবল খেলা সম্পর্কে, প্রমথ চৌধুরীর এই বক্তব্য খুবই সরল এবং বাছবিচারহীন বলেই মনে হয়। বাংলা অঞ্চলে ফুটবল খেলাকে ছেলেখেলা হিসেবে দেখা খুব মুশকিল। বাংলায় ফুটবলের সাংস্কৃতিক-রাজনীতি আছে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ব্যাপার-স্যাপার আছে, আছে শ্রেণিচরিত্র।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাঙালির খেলাধুলার-সংস্কৃতির এন্তার বর্ণনা আছে। প্রাচীন সাহিত্য ঘেঁটেঘুঁটে দেখা যায়, আদিতে শিকার বা মৃগয়া বাঙালির খেলার একটা অংশ ছিল। নিম্নবর্গের বাঙালিদের কাছে শিকার ছিল জীবিকা ও ক্রীড়া দুই-ই। উচ্চবর্গের কাছে এটি ছিল শুধুই খেলা। বাংলা সাহিত্যের ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্য-এর ‘কালকেতুর বাল্যক্রীড়া’ উপশিরোনামে দেখা যায় সেখানে খেলা ও শিকার সমার্থক। কবির ভাষায়, ‘শিশুগণ সঙ্গে ফিরে, তাড়িয়া শশারু ধরে/দূরে পশু পালাইতে নারে।/বিহঙ্গ বাট্যুলে বধে/লতাতে জড়ায়ে বান্ধে/কান্ধে ভার বীর আস্যে ঘরে।’ শুধু মধ্যযুগের নায়ক কালকেতু কেন, বাংলাদেশে বর্তমানে জীবিত পুরোনো প্রজন্মের যাঁরা আছেন, তাঁরাও নিশ্চয় জানেন, শিকার তাঁদের কাছে একটা আনন্দময় খেলাই ছিল বটে। বাঙালির খেলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙ্গালীর ইতিহাস বইয়ে বলেছেন, ‘কুস্তী বা মল্লযুদ্ধ এবং নানাপ্রকারের দুঃসাধ্য শারীর-ক্রিয়া ছিল নিম্ন কোটির লোকদের অন্যতম বিহার (পড়ুন: খেলা)। পবনদূতে নারীদের জলক্রীড়া এবং উদ্যান রচনার উল্লেখ আছে; এই দুটিই বোধ হয় ছিল তাঁহাদের প্রধান শারীর-ক্রিয়া। দ্যূত বা পাশাখেলা এবং দাবা খেলার প্রচলন ছিল খুব বেশি। পাশাখেলাটা তো বিবাহোৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ বলিয়াই বিবেচিত হইত।’ (পৃ. ৪৪৯)। দাবা খেলার প্রসঙ্গ তো বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ-এ হরহামেশাই ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া মধ্যযুগের সাহিত্যে লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়ের উল্লেখও বেশ দেখা যায়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ফুটবল খেলাটা বাঙালির নিজস্ব খেলার তালিকায় নেই। খাঁটি বাংলায় বলতে গেলে বাংলায় ফুটবলের ইতিহাস শুক্কুরে শুক্কুরে সাত দিনের ইতিহাস।

বাংলামুলুকে ফুটবল খেলাটা ঢুকেছে মূলত ইংরেজ উপনিবেশের হাত ধরে। ইংরেজ রাজ-কর্মচারীরা তাঁদের বিকেলের সময় কাটানোর জন্য নিজেদের মধ্যে এই খেলাটা খেলত। এক এলাকার রাজ-কর্মচারীরা অন্য এলাকার রাজ-কর্মচারীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে প্রতিযোগিতারও আয়োজন করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৫৪-এর পর থেকে) কলকাতা ও ভারতের অপরাপর অঞ্চলে এই খেলার খেলোয়াড় এবং দর্শক দুটোই ছিল ইংরেজ। ক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলার ইংরেজ-সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি। আরও পরে দর্শক হিসেবে ‘সাধারণ মানুষের’ সমাগম ঘটতে থাকে। তবে এই ‘সাধারণ’ বলতে নিশ্চয় খেটে খাওয়া মানুষ না। এই ‘সাধারণের’ও একটা শ্রেণি-পরিচয় ছিল। তারা অবশ্যই সেই শ্রেণি, যারা এ দেশে ইংরেজ শাসনের স্থানীয় খুঁটি হিসেবে কাজ করত অথবা পড়ালেখা শিখে যারা কালো চামড়ার ইংরেজ হয়ে উঠতে চাইত।

হেয়ার স্কুলের ছাত্র ও ‘অভিজাত’ বংশের ছেলে নগেন্দ্রপ্রসাদের হাত ধরে ফুটবল বাঙালির মধ্যে খেলা হিসেবে প্রবেশ করে। হেয়ার স্কুলের এই ছাত্রটি নিশ্চয় ইংরেজ অনুকরণের মনোস্তত্ত্ব থেকে এ খেলাটা শিখতে চেয়েছিলেন। ১৮৮৪ সালে নগেন্দ্রপ্রসাদ যখন তাঁর সমমনা বন্ধুদের নিয়ে ডালহৌসি ফুটবল ক্লাব গঠন করছেন, তার আগের দশকে বাঙালির ইংরেজ অনুকরণ নিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩), দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) প্রমুখ রচনা করেছেন অসাধারণ অসাধারণ সব প্রহসন। যা হোক, নগেন্দ্রের ডালহৌসি ফুটবল ক্লাব বেশি দিন টেকেনি। অগত্যা ১৮৮৫-তে ‘শোভাবাজার ক্লাব’ নামে তিনি আরেকটি ক্লাব গঠন করেন। ক্লাবের নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে ইংরেজের ফুটবল কীভাবে স্থানীয় হয়ে উঠছে। ১৮৮৯-তে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় আরেকটি স্থানীয় ক্লাব—মোহনবাগান স্পোর্টস ক্লাব। শোভাবাজার ক্লাব ১৮৯২ সালে যখন ট্রেসড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে ইংরেজ ক্লাব ‘ইস্ট সারে রেজিমেন্ট’কে হারিয়ে দেয়, তখন বাংলায় ফুটবলের নতুন মানে দাঁড়ায়। আরও নতুন মানে দাঁড়াল ১৯১১-এ, মোহনবাগান স্পোর্টস ক্লাব ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শিল্ড কাপ জেতার পর। ফুটবল সে সময় আর নিছক ইংরেজ-অনুকরণের বিষয় হিসেবে না থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়। ১৯১১ সালের ২৯ জুলাইয়ের সেই ইংরেজ-বাঙালি খেলায় মানুষের ঢল নেমেছিল। এমনকি ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে হাজার হাজার মানুষ সেদিন গিয়েছিল কলকাতার সেই খেলা দেখতে। কেন গিয়েছিল? ওই দলের ১১ জনের ১০ জনই পূর্ব বাংলার খেলোয়াড় ছিল সে জন্য? শুধু তাই নয় বোধ হয়। তারও চেয়ে বেশি কিছু। এর অন্যতম কারণ বোধকরি স্বামী বিবেকানন্দের ফুটবল-সম্পর্কিত সেই বাণী, ‘পদাঘাতের বিপরীতে পদাঘাত কেবলমাত্র ফুটবলেই সম্ভব।’ ফুটবল সেদিন হয়ে উঠেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রকাশের দারুণ এক অস্ত্র। ফুটবল খেলা সেদিন আর প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় শুধু ‘উদ্দেশ্যবিহীন’ আনন্দদায়ক খেলা রইল না, হয়ে উঠল ‘প্রতিশোধ গ্রহণের হিরণ্ময় হাতিয়ার’। ফুটবল যে সেই কালে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল, এ কথা বিখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর ব্লাক হোল অব এম্পেয়ার (২০১২) বইয়ে সবিস্তারে দেখিয়েছেন। কথিত আছে ১৯১১-এ বঙ্গভঙ্গ যে রদ হয়েছিল, ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেই জাগরণ এর অন্যতম কারণ। হয়তো এ কথা মিথ, মানে মিথ্যার মতো, কিন্তু সত্যের চেয়েও বেশি সত্য।

১৯১১ সালের মোহনবাগানের জয় বাঙালির মধ্যে এত গভীর দাগ কেটেছিল যে এই জয় নিয়ে ১৩১৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যার মানসী পত্রিকায় করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় এক কবিতা লেখেন। কবিতার একাংশ এরূপ,Ñ‘জেগেছে আজ দেশের ছেলে পথে লোকের ভীড়,/অন্তঃপুরে ফুটল হাসি বঙ্গরূপসীর।/গোল দিয়েছে গোরার গোলে বাঙালির আজ জিত,/আকাশ ছেয়ে উঠছে উধাও উন্মাদনার গীত।/আজকের এই বিজয়বাণী ভুলবে নাকো দেশ,/সাবাশ সাবাশ মোহনবাগান খেলেছ ভাই বেশ।’ এই কবিতাটি পরে গান আকারে গীত হয় এবং কলকাতায় খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯১১-এ বাঙালির হাতে ইংরেজ যখন ফুটবলে পরাজিত হলো, কাজী নজরুল ইসলামের বয়স সে সময় ১২ বছর। তখন দারিদ্র্যের সঙ্গে অভাবনীয় সংগ্রামে রত এক কিশোর তিনি। এই কিশোর আর মাত্র ১১ বছরের ব্যবধানে ইংরেজের ভিত-কাঁপানো সব কাব্য-কবিতায় ভরিয়ে তুললেন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার। ১৯২০-এর দশকের প্রায় পুরোটা সময় নজরুলের কেটেছে মূলত প্রবল ইংরেজ বিরোধিতায়। তাঁর বইয়ের পর বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে। জেল খেটেছেন ইংরেজবিরোধী কবিতা লেখার দায়ে। এই কবি যদি দেখেন আধিপত্যবাদী শোষক ইংরেজকে কোনো ফুটবল খেলায় বাঙালি ছেলেরা পরাজিত করেছেন, তখন তিনি কেমন উন্মাদনা বোধ করতে পারেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। সালটি ১৯২৮। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়। সেবার মোহনবাগান ক্লাব এক ইংরেজ ফুটবল ক্লাবকে (ডিসিএলআই?) পরাজিত করে। ইংরেজ উৎখাতই যাঁর কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয়, তিনি বাঙালির এই জয়ে সৃষ্টিছাড়া আনন্দে ভাসবেন—এ আর নতুন কী! ফলে সেদিনের সেই জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেন। উদ্দেশ্য ইংরেজ-বধ উদ্‌যাপন! কল্লোল যুগ বইয়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশরঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন।’ (পৃ. ১২৬)। কারণ হিসেবে অচিন্ত্য বলেছেন, ইংরেজের বিরুদ্ধে সেই খেলায় ঢাকার ছেলে মনা দত্ত বা রবি বোস বেশ কয়েকটা গোল দিয়েছিলেন। অচিন্ত্যের ভাষায়, ‘ঢাকার লোক যখন এমন একটা অসাধ্য সাধন করল তখন মাঠ থেকে সিধে ঢাকায় চলে না যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যে দেশে এমন একজন খেলোয়াড় পাওয়া যায় সে দেশটা কেমন দেখে আসা দরকার।’ (পৃ. ১২৬)। আদতে সৃষ্টিছাড়া এক আনন্দে আত্মহারা হয়েই তিনি ঢাকা এসেছিলেন। গোলাম মুরশিদ তাঁর বিদ্রোহী রণক্লান্ত (২০১৮) বইয়ে নজরুলের সেবারের হঠাৎ ট্রেনে চেপে ঢাকা আসা সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিজের পরিবারকে বলে যাওয়ার বালাই নেই, সওগাতকে জানানোর দরকার নেই, প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। দায়িত্বহীনতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতার দৃষ্টান্ত বটে।’ (পৃ. ৩১৮)। কিন্তু সত্যিই কি এটা ‘দায়িত্বহীনতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতা’! নাকি ইংরেজ-বধের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ! ইংরেজকে ফুটবলে পরাজিত করার মধ্যে কি নজরুল তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন মাতৃভূমির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেখে আত্মহারা হয়েছিলেন! ব্যক্তিটি যখন নজরুল তখন তাই হওয়াটাই তো স্বাভাবিক!

ফুটবল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যেমন শাণিত করেছে তেমনি বিতর্কও কম তৈরি করেনি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফুটবল এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে সাহিত্যে খেলার প্রসঙ্গ মানেই ফুটবল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর শ্রীকান্ত (১৯১৭) উপন্যাসে ফুটবল খেলার এক বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ। সন্ধ্যা হয় হয়। মগ্ন হইয়া দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই। হঠাৎÑ ওরে বাবাÑএ কি রে! চটাপট্ শব্দ এবং মারো শালাকে, ধরো শালাকে!…পাঁচ-সাতজন মুসলমান-ছোকরা তখন আমার চারিদিকে ব্যূহ রচনা করিয়াছেÑপালাইবার এতটুকু পথ নাই।’ (শ্রীকান্ত, প্রথমপর্ব, পৃ.Ñ২) শরতের এই ‘বাঙ্গালী’ এবং ‘মুসলমান’ দল বিভাজন উত্তরকালে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রশ্ন ওঠে, তবে কি শরৎচন্দ্র মুসলমানদের বাঙালি মনে করতেন না! নাকি শরৎচন্দ্র সমকালের হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছিলেন মাত্র। এ এক ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়ই বটে!

মিলন আর দ্বন্দ্ব যা-ই সৃষ্টি করুক না কেনো বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে ফুটবল খেলা বাংলা অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। বর্তমানে ফুটবল গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে প্রবেশ করলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে অবিভক্ত বাংলায় ফুটবল ছিল মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকর্ষণীয় খেলা। ফুটবল যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির খেলা ছিল তা জসীমউদ্‌দীনের হাসু (১৯৩৮) কাব্যগ্রন্থের ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ কবিতা দেখলেই বোঝা যায়। এই কবিতায় দেখা মেলে জসীমউদ্‌দীনের কাব্য-কবিতার মধ্যে সবচেয়ে ‘স্মার্ট’ নায়ককে—ইমদাদ হক। সোজন, রূপাই নামের বিপরীতে এই নাম ‘স্মার্ট’ আর নির্দিষ্ট শ্রেণি-চিহ্নিতই বটে। আবার এই যুবক থাকেও শহরের ‘মেসে’। কবির ভাষায়, ‘আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়।’ সমকালের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ফুটবল কী এক তীব্র উন্মাদনা ছড়িয়েছিল তার এক বিশ্বস্ত ছবি পাওয়া যায় এই কবিতায়। ইমদাদ হককে সকালবেলা গিঁটে গিঁটে মালিশ আর সেঁক দিতে দিতে মেসের চাকর ‘লবেজান’ হয়ে যায়। সবাই ভাবে ইমদাদ ‘ছমাসের তরে পঙ্গু যে হল হায়’। কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় দেখা গেল ‘বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,/ভাঙা কয়খানা হাতে-পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।’

ফুটবল আনন্দদায়ক খেলা—এটা যেমন সত্যি, তেমনি এ-ও সত্যি যে ফুটবলের সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক-রাজনৈতিক পরিচয় আছে। আছে সাহিত্যের অন্দরমহলে হানা দেওয়ার মতো অসামান্য ক্ষমতা। আছে প্রবল সম্মোহনী শক্তি। আপাত নিরীহ এই খেলাটার মধ্যে আছে ইতিহাসের সরল-জটিল সব অলিগলি আর আলো-আঁধার।